শুধুই গল্প



বৌমা, ও বৌমা, ঘর থেকে বেড়িয়ে এসো। নিলু তুইও বের হয়ে আয়। জরুরী কথা আছে।"
ভোর বেলা মর্নিং ওয়াক থেকে ফিরেই নীলা দেবীর এমন হাঁক ডাকে ঋতুর ভোরের আরামের ঘুমের দফারফা। মনে মনে একটু বিরক্ত হলেও শ্বাশুড়ী মায়ের "বৌমা" ডাকে আর তুমি সম্বোধনে ঋতুর কপালটা একটু কোঁচকালো। শ্বাশুড়ী মা তো তাকে ঋতু বলেই ডাকেন, একমাত্র রেগে গেলেই বৌমা আর তুমি হয়, না হলে তুই করেই বলেন। তবে আজ কি আবার হলো, সে তো এখনো ঘুম থেকেই ওঠে নি। ঋতু ভাবতে লাগলো কাল কি কিছু করেছে? কিন্তু রাতে ঘুমোতে যাবার আগে তো সব ঠিক ছিলো। ঋতুর ভাবনার মধ্যেই আর একবার ডাক পড়লো। এবার অবশ্য নিলয়ের নাম নিয়ে,
" কি রে নিলু, কথা কানে যাচ্ছে না? বেরিয়ে আয় শিগগিরই। আমার কথার জবাব দিয়ে যা। নইলে আজ কিন্তু আমি কুরুক্ষেত্র করবো।"
ঋতু আর নিলু ঘর থেকে বেরোতেই ওনার প্রশ্ন, " বৌমা আমি কবে তোমাকে দামী কাপের সেট ভাঙবার জন্য তোমার এক বেলার খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি? কবে নিলুর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া নিয়ে মুখ কালো করেছি? আর সবচাইতে বড় কথা বাড়িতে ভালো কোনো জিনিস আনলে নাকি আমি আগে খেয়ে নিই, তোমাকে দিই না?"
নীলা দেবী এতো গুলো কথা একসাথে বলে একটু থামলেন। ঋতু তো আকাশ থেকে পড়লো। ও আবার কবে এসব বললো? ঋতু কিছু বলবার আগেই নীলা দেবীর আবার হুঙ্কার, " আরো আছে, সবগুলো এখন মনে পড়ছে না। তবে আমি যে তোমাকে অত্যাচার করি, এমন সব মিথ্যে কথা বলতে তোমার একটুও বাঁধলো না বৌমা?"
" আমি এগুলো বলেছি?" ঋতু অবাক হলো।


" শুধু বলো নি, লিখে সব্বাইকে জানিয়েছো। হায়! হায়! না জানি কত লোক পড়েছে আর পড়ে আমাকে কতই না খারাপ শাশুড়ী ভেবেছে। শেষে আমার কপালেও এই ছিলো?"
" কোথায় লিখেছি?" ঋতুর কাছে কিছু পরিষ্কার হচ্ছে না। "মা সব খুলে বলোতো কি হয়েছে?"
" খুলে কি আর বলবো, তুমি তো সবই খুলে দিয়েছো।"
" তুমি মর্নিং ওয়াকে যাও নি?"
" মর্নিং ওয়াকে গিয়েই তো শুনে এলাম।"
" কি শুনলে?"
" সারাদিন ল্যাপটপে কি খুট খুট করো আজ বুঝতে পারছি। তুমি ওখানে আমার নামে বদনাম করো। তারপর তোমাদের ওই ফেসবুকে ছেড়ে দাও।"
" কে বলেছে তোমাকে?"
" সামনের বাড়ির দীপুর মা দিদি বললো। দীপুর বউ নাকি ফেসবুকে পড়েছে, তুমি সেখানে লিখেছো, তোমার শ্বাশুড়ী কত খারাপ।"
" দীপুর বউ বললো?"
" তা নয়তো কি, দীপুর বউ বলেছে, নিলুদার বউ খুব সুন্দর লেখে। কিন্তু ওর শ্বাশুড়ী মনে হয় খুব জ্বালায়। সেই কথাগুলোই গল্প হয়ে বেরিয়ে আসে। নাহলে এতো সুন্দর করে মনের ভাব কিভাবে ফুটিয়ে তোলে?"
এবার যেনো ঋতু একটু একটু সব বুঝতে পারলো। ঋতু টুকটাক গল্প লিখে ওর টাইম লাইনে দেয়। দীপুর বউ সেখানেই পড়েছে। কারণ ঋতুর গল্পের শুরুতেই ছিলো, 'আমার শ্বাশুড়ীকে দেখলে বোঝা যায় না, উনি কতটা নিষ্ঠুর, উনি আমাকে কত কষ্ট দেন.......................' -- এভাবে। সেটা পরেই দীপুর বউ তার শ্বাশুড়ীকে নিজের মতামত নিজের মতো করে বর্ণনা করেছে।
সব শুনে বুঝে ঋতু তো হাসতে শুরু করে দিলো। আর নিলু আর নীলা দেবী কিছু না বুঝে ঋতুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঋতু গিয়ে তার শ্বাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরলো। বললো,
" তাই বলো, দীপুর বউ আমার গল্প পড়ে নিজের মতো করে সাজিয়ে বলেছে।"
" গল্প পড়ে, মানে?"
" আরে মা, তুমি তো জানোই, আমি অল্প সল্প গল্প লিখি আর ফেসবুকে দিই। সেখানেই আমার গল্পের নায়িকা তার শাশুড়ীর কথা বলেছে। তার নিজের বয়ানে আমি গল্পটা লিখেছি। তাই সেটা "আমি" হয়ে গেছে। ওটা সত্যিকারের আমি নই।"
" সত্যি বলছিস?" একগাল হেসে নীলা দেবী বললেন।


" সত্যি নয়তো কি, তুমি কি সত্যি করে আমার সাথে অমন করো নাকি?"
" সেই তো আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমায় এমন করে বললো, --আমি ভাবলাম এমন কথা তো ঋতু বলবে না।"
" হু, ভেবেছো? ভাবলে অমন করে "বৌমা", "তুমি" -- এসব বলতে নাকি? বলবো না যখন জানো, তখন ভাবলে কেনো?
তোমার নিজের ওপর তোমার বিশ্বাস নেই?"
" আসলে তোকে খুব ভালোবাসি তো।"
" জানি তো, তুমি তো আমার সোনা মা।"
" তুই তো আমার হীরের টুকরো মেয়ে।"
এতোক্ষন নিলু দাঁড়িয়ে সব দেখছিলো। এখন কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ার রাগ দেখিয়ে বললো, " তোমাদের সোনা-রুপো, হীরে-মুক্তোর দর ঠিক হলে একটু চা বসিয়ে দিও। এমনিতেই তো আরামের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিলে।" বলেই নিলয় ঘরে ঢুকে গেলো।

Thank you for reading, please share this topic.

Comments